বুদ্ধি যার বল তার
একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে যে কৃত্রিম মেধা আমাদের বাঁচার ধরণকে পাল্টে দিয়েছে, বদ্লে দিয়েছে চিন্তা চেতনার রকম এবং সর্বোপরি সৃষ্টি করেছে ভয় বিতর্ক বহুল আলোচনার, তা তৃতীয় দশকে এসে হয়ে উঠেছে আরো ব্যাপক। কিন্তু নিজস্ব চিন্তার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে সর্বোচ্চ ও সীমাহীন বুদ্ধিধারীকে সহায় হিসেবে যাঞচা করার শুরুটা ঠিক কবে?
দেবলীনা সমাদ্দার
Oct 2, 2026

চলতি মাসে স্বাস্থ্য ও জীববিজ্ঞান গবেষণার জন্য বিনামূল্যে ডেটা তৈরির লক্ষ্যে ১২৫ মিলিয়ন ইউ এস ডলারের প্রতিশ্রুতির অংশবাবদ এক দফা চেক দিয়ে ওপেন এআই এর জীবন বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান জ্যাকব ট্রেফেথন ওপেন এ আই ফাউন্ডেশনের দাতব্য শাখাকে বিশ্বের অন্যতম ধনী অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছে।
লিখছেন দেবলীনা সমাদ্দার
একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে যে কৃত্রিম মেধা আমাদের বাঁচার ধরণকে পাল্টে দিয়েছে, বদ্লে দিয়েছে চিন্তা চেতনার রকম এবং সর্বোপরি সৃষ্টি করেছে ভয় বিতর্ক বহুল আলোচনার, তা তৃতীয় দশকে এসে হয়ে উঠেছে আরো ব্যাপক। কিন্তু নিজস্ব চিন্তার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে সর্বোচ্চ ও সীমাহীন বুদ্ধিধারীকে সহায় হিসেবে যাঞচা করার শুরুটা ঠিক কবে? লক্ষ করলে দেখা যাবে মানব সভ্যতার প্রথম দিন থেকেই মানুষ নিজের শ্রম লাঘব করতে চেয়েছে এবং একইসাথে তার আশপাশের সমস্ত কিছু সম্পর্কে কৌতুহলী হয়েছে। এই দুই বাসনার মিলনেই জন্ম নিয়েছে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, নানাবিধ কলাকৌশল। সেই কাজ করতে গিয়ে যখন যখন মানুষের মনে হয়েছে আমার দ্বারা ততটা হচ্ছে না যতটা হলে শান্তি পাই, তখনই সে আশ্রয় নিতে চেয়েছে সীমাহীন মেধার কাছে — যার ক্লান্তি নেই, ঘ্যানঘ্যানানি নেই, সর্বোপরি কোনও 'না' নেই। অ্যাবাকাসের মতো গনকযন্ত্র তার ব্যতিক্রম নয়। নিজের মাথার হিসেবের বোঝা অন্যের মাথায় চাপিয়ে দেওয়া ; এমন কারোর মাথায়, যার মাথায় আছে হুকুমের দাসত্ব করার অসীম আনুগত্য। সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে এই মঞ্চে আসবেন চার্লস ব্যাবেজ, আসবেন অ্যালান টিউরিং, জন ম্যাককার্থি, জোসেফ প্রমুখরা। এই বুদ্ধির ব্যবসায় বলশালী হয়ে উঠবে ঠান্ডা লড়াই পরবর্তী সময়ে তাবর তাবর সব মার্কিন, ইউরোপীয় সংস্থাগুলি। অর্থাৎ বুদ্ধি যার, বল তার। সে ঠিক করবে পৃথিবীবাসীর হাঁটা চলা, কথা বলা, এমনকই চিন্তা করাও! সেইই ঠিক করবে কারে কয় জনহিতকর কাজ, সেইই আবার বাতিল করবে প্রযুক্তিগতভাবে খোঁড়া মনুষ্যকে।
আমরা কেউ হয়তো ভাবি সুতো লাটাইয়ের কথা শুনছে না, অর্থাৎ লাটাই তোমার দিন ফুরাইয়াছে, কিন্তু বল তাদের যারা এই লাটাই সুতোর মধ্যেই নেই, তারা জানে কোন ঘুরিকে কতক্ষণ আকাশে থাকার জন্য কোন লাটাইকে নির্দেশ দেব। গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের চ্যাটবট আজ অর্ধ শতক পেরিয়ে তবে গিয়ে জনপ্রিয় জিপিটির ব্যবসা ধরেছে। কিন্তু বর্তমান শতাব্দীর গোড়ায় একটি জার্মান ডকুমেন্টরি (প্লাগ অ্যান্ড প্রে) -তে প্রথম চ্যাটবট এলিজ়ার নির্মাতা জোসেফ ওয়েজ়েনবামের সেক্রেটারি সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেন, তিনি প্রথমবারের জন্য যখন এলিজ়ার সাথে কথা বলছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল এর কাছে মনের গোপনতম কথাগুলো বলে ফেলা যায় এবং সেই কারণে উনি এলিজ়ার সাথে চ্যাট করার সময় জোসেফকে ঘর থেকে চলেও যেতে বলেন।
ওপেন এ আই ফাউন্ডেশনের দপ্তর
কৃত্রিম মেধাকে ঘিরে এই ইলিউশন মানব সভ্যতার ইতিহাসে মনুষ্যেতর কোনও মেধার (কৃত্রিম) কাছে নির্ভরশীল হয়ে পড়ার প্রথম (সম্ভবত) নিদর্শন।
এখন বড় বড় মাথারা যতই এ আই এর জন্য মানবজাতি বিপন্ন বলে ডাক দিক, সুতো হাত থেকে বেরিয়ে গেছে, তাতে দেদার উড়ছে ঘুরি, আর তাদের টুপ্টাপ্ কেটে পড়ার ফায়দা লুটছে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিধে লুঠার দল। কে কী উদ্দেশে কী করছে বোঝা দায়, তবে ঝাপসা চোখে সবই যেন ইলিউশন। একদিকে যেমন এ আই তৈরি করছে নতুন বিজ়নেস মডেল, তেমনই সম্প্রতি একের পর মানব কল্যানে এথিকস মেনে কাজ করানোর জন্য এ আই সংস্থাগুলির দাবী, তাদের আশা, কারো কারো অআশঙ্কা সবই যেন ভিডিও গেমের একেকটা রাউন্ড। কখনও মজার, কখনো বা ভয়। চলতি মাসে স্বাস্থ্য ও জীববিজ্ঞান গবেষণার জন্য বিনামূল্যে ডেটা তৈরির লক্ষ্যে ১২৫ মিলিয়ন ইউ এস ডলারের প্রতিশ্রুতির অংশবাবদ এক দফা চেক দিয়ে ওপেন এআই এর জীবন বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান জ্যাকব ট্রেফেথন ওপেন এ আই ফাউন্ডেশনের দাতব্য শাখাকে বিশ্বের অন্যতম ধনী অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছে। জ্যাকবের বক্তব্য, এ আই যেন মানবজাতির উপকারে আসে। একইভাবে ভারতীয় ডিফেন্সের পক্ষ থেকেও সদ্য জানানো হয়েছে সেনাবাহিনীতে এ আই প্রযুক্তি আসতে চলেছে।
এখন উপকারে তো আসতে চায় সবাই, কিন্তু বুদ্ধি কার আর বল কার? লাভের গুর রাখাই বা আছে কোথায় আর পিঁপড়ে হাঁটছেই বা কোন পথে?
