ধম্ম ও মহাত্মা
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী হয়ে ওঠেন ভারতীয় গণআন্দোলনের পুরোধা এবং জনসাধারণের কাছে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দেবতুল্য। গান্ধী বাবাকে ঘিরে তৈরি হতে শুরু করে নানা রকম কিংবদন্তি। তিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন তিনি তাদেরই একজন। তিনি যা বলবেন, করবেন তা তাদের ভালোর জন্য। অতএব তাদের উচিত তার কথা শোনা।
শ্রমণা মিত্র
Oct 2, 2026

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী হয়ে ওঠেন ভারতীয় গণআন্দোলনের পুরোধা এবং জনসাধারণের কাছে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দেবতুল্য। গান্ধী বাবাকে ঘিরে তৈরি হতে শুরু করে নানা রকম কিংবদন্তি। তিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন তিনি তাদেরই একজন। তিনি যা বলবেন, করবেন তা তাদের ভালোর জন্য। অতএব তাদের উচিত তার কথা শোনা।
গান্ধীজী কি মৌর্য সম্রাট অশোকের মতাদর্শ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন ? এই প্রশ্নটির উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ ছিলেন। গান্ধীজি সম্রাট অশোকের জীবন ও দর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন ।শুধু তাই নয় তিনি অশোকের রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। মূলত অহিংস মতাদর্শের ক্ষেত্রে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ,অহিংসা ভারতের নিজস্ব ঐতিহ্য। কোনো বিদেশি বা নতুন ধারণা নয়। কারণ অশোক যুদ্ধ ও সহিংসতা ত্যাগ করে অহিংসার পথ বেছে নিয়েছিলেন। যদিও অশোকের ক্ষেত্রে বিষয়টা মানবিকতার চেয়ে বেশ অনেক বেশি অর্থনৈতিক সংকটকে সামলানোর চেষ্টা ছিল ।আর গান্ধীজী এমন এক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রচার ও প্রসারে সচেষ্ট ছিলেন যেখানে কোনো মানুষ নির্ভয়ে যোগদান করতে পারবে। অহিংসার আদর্শে বৈপ্লবিক সংগ্রামের মতো মৃত্যুভয় ছিল না।
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী হয়ে ওঠেন ভারতীয় গণআন্দোলনের পুরোধা এবং জনসাধারণের কাছে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দেবতুল্য। গান্ধী বাবাকে ঘিরে তৈরি হতে শুরু করে নানা রকম কিংবদন্তি। তিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন তিনি তাদেরই একজন ।তিনি যা বলবেন, করবেন তা তাদের ভালোর জন্য ।অতএব তাদের উচিত তার কথা শোনা।
সম্রাট অশোক যেমন নিজের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ধম্মের নৈতিকতাগুলোকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন ,অনেকটা ওই সাপও মরল লাঠিও ভাঙলো না'র মতো -রাজনৈতিক ক্ষমতার বিস্তারও হল অথচ যুদ্ধের জন্য শ্রম ও অর্থনীতির ক্ষতিও হল না ঠিক তেমনি মহাত্মা তার লোকহিতকর মানবিক জীবনচর্চার মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নিজের দার্শনিক ক্ষমতার একাধিপত্য স্থাপন করতে চেষ্টা করেছিলেন। এসবের জন্য অশোক একটা বিশাল ব্যবস্থা করে ধম্ম অমাত্যদের নিয়োগ ,টিয়োগ করেছিলেন ধম্ম প্রচারের জন্য ।আর গতিশীলতার যুগে রেলগাড়ি চড়ে গান্ধীজীর শুদ্ধ জীবন যাপনের কথা জনসম্পর্কের কাছে অশোকের চেয়ে অনেক বেশি ছড়িয়েছিল।

আবার গান্ধীজী নগর জীবনের অতিরিক্ত-ভোগবাদী বৈশিষ্ট্যকে নাকশিটকে গ্রাম্যজীবনকে আদর্শ মনে করতেন। এখানেও অশোকের সাথে তার মিল। অশোক প্রজাদের বিদ্রোহ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে তার তৃতীয় প্রধান শিলালিপিতে - "অপব্যয়ত চ অপভন্ডত চ",প্রাকৃত ভাষায় ব্রাহ্মী হরফে এই উপদেশ দিয়েছিলেন ।যার অর্থ হল, ব্যয় করার ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ ও সম্পদ রাখার ক্ষেত্রে সংযম অর্থাৎ অসুখ মিতব্যয়ীতা ও সরলতার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন । অতএব বোঝাই যাচ্ছে, গ্রাম্য জীবনের প্রাধান্য আর মিতব্যয়ীতা দুটোই অর্থনৈতিক চাহিদাকে কমিয়ে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা। যদিও গান্ধীজী স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতি ও ন্যাস্ততা তত্ত্বের কথা বলে চরকা ও খাদির প্রচার করেছিলেন কিন্তু তিনিও জানতেন তৎকালীন ভারতীয় জীবনযাত্রার অর্থনীতিতে বৈদেশিক প্রভাবের সামনে গ্রামীণ শিল্প বিশ্ববাজারে দাঁড়াতে পারবে না ।
তাদের মধ্যে মূল পার্থক্যের জায়গা হল ,একজন রাজনৈতিক ক্ষমতার একাধিপত্য চেয়েছিলেন চক্রবর্তী সম্রাট হওয়ার জন্য আর আরেকজন জনমতকে নিয়ন্ত্রণ করে রাজনৈতিক দর্শনে একাধিপত্য পেয়ে হয়ে উঠেছিলেন মহাত্মা বাপু।
