সিনেপিডিয়া

দুনিয়া চলে এস কিউব-এর ফর্মুলায়

এস ফর সেক্স, এস ফর স্যাডিজ়ম, এস ফর শক্!... পৃথিবীটা যেন একটা পাগলাগারোদ, আর মানুষকে শুধু ধরে ধরে শক দিয়ে যেতে হবে। — এমন সংলাপে মোড়া একটা দৃশ্য রচনা করে তপন সিনহা তামাম দুনিয়ার টিঁকে থাকার ফর্মুলা বাতলে দিয়েছিলেন যেন।

অ

অয়ন সাঁতরা

Oct 2, 2026

দুনিয়া চলে এস কিউব-এর ফর্মুলায়

তপন সিনহার জন্মদিনটা ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যান্য ইন্ডে পায়োনিয়ার ফিল্মমেকারদের মতো অতটা ঘটা করে লাইম লাইটে আসে না। উনি ভারতীর ফিল্মের ইতিহাসের পাতায় আছেন, বেশ জ্বলজ্বলে অক্ষরেই আছেন, তবুও ট্রেন্ডে ভেসে বেরোনো নাম হননি। এখন ট্রেন্ড বড় সাংঘাতিক জিনিস, তার সুতো কার হাতে, কে যে তার মালিক তা বোঝা দায়। জীবদ্দশায় ওঁর ছবির বিক্রি ঋত্বিক বা মৃণাল এর তুলনায় কতটা বেশি তা আর্কাইভ খুঁড়লেই পাওয়া যাবে, তবুও ভাইরাল লিজেন্ড হিসেবে স্ক্রোল হতে থাকবে আঙুলে আঙুলে এমনটা কেন হয়ে উঠলেন না? তপন সিনহার জন্মদিবসে ওঁর পপুলার ফিগার হয়ে ওঠো না হয়ে ওঠার ব্যখ্যায় যাওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, বরং ওঁর ছবির সাবজেক্ট কীভাবে আমাদের বেঁচে থাকার রকমের একেবারে গোড়ায় গিয়ে যেভাবে মুচড়ে দেয় সেটাই খানিকটা দেখব। সেই মোচড় খাওয়ার ঘা একবার ওঁর ছবি থেকে প্রাপ্ত হলে আর কোনওদিন তা ভোলা যায় না, আর সেই অমর ভিজ়ুয়াল এক্সপেরিয়েন্সের স্মৃতি থেকেই ভেসে ওঠে নেপথ্যের গোলগাল ফর্সা মুখওয়ালা লোকটার ছবি, যিনি সমান্তরাল আর বাণিজ্যিক ছবির মাঝে সেতু হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে দু তরফ থেকেই কিছুটা দূরত্বে থেকে গেছেন।

তপন সিনহার ছবিগুলি দেখলেই বোঝা যায় যে সেগুলি অনেকটাই আজকের দিনে প্যান ইন্ডিয়ান ফিল্মে আর্ট ও কমার্সিয়াল কাজের মধ্যে ক্রমশ কমে আসা গ্যাপের পূর্বসূরি। ভারতীর সিনেমার ব্যতিক্রমী সম্পদ যে গান, সেটা তিনি পুরো দস্তুর ব্যবহার করেছেন নিজের ছবিতে কিন্তু কোথাও সেগুলো গতানুগতিক প্যানপ্যানানিতে পরিণত হয়নি। স্টারডমকে কাজে লাগিয়েছেন, কিন্তু অভিনয়ের মাত্রা নিয়ে কোথাও আপোষ করেননি। ওঁর পর্যবেক্ষণ থেকেছে সব সময় বস্তুনিষ্ঠ। নিজে বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন, সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে যে সাবজেক্টকে ধরতেন, তাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেই কাটাছেঁড়া করতেন বলেই বোধহয় ওঁর কাজে একটা আলাদা ফ্লেভার পাওয়া গিয়েছিল ক্রমশ, যা ছিল একাধারে ইন্ট্রোস্পেক্টিভ আবার অপরদিকে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজ়মের পর্যায়ে।

তপন সিনহার দু একটা সিনেমা দেখলেই ধারণা তৈরি হবে যে ওঁর কাজ মানেই একটা সাবজেক্টকে কেন্দ্রে রেখে গল্পের মধ্যে একটা আশ্চর্য গ্রাফ তৈরি করে দেওয়া। উনি দর্শকের দিকে নিজের ছবিকে চার্জ করেননা, বা খুব রিদিমক্যালি বইয়ে নিয়ে যান না, বরং একটা নির্দিষ্ট টাইম আর স্পেসের মধ্যে গিলে ফেলেন। ছবির ইন্টারভেল হতে হতে আমাদের আশপাশটা সিনেমার জগতে ঢুকে গেছে। আর সাধারণ থেকে সাধারণতর মানুষও এক ধরণের অজানা অস্বস্তি অনুভব করতে শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে। কিছু সিনেমা থাকে যার টেকনিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট আমাদের অস্বস্তি দেয়, কিন্তু তপন সিনহার ভিজ্যুয়াল ন্যারেশন আমাদের অস্বস্তি দেয়। তাই 'আতঙ্ক'-র 'মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি' — এই সংলাপ আমাদের আজীবন তাড়িয়ে বেড়ায়, কিংবা 'এক ডক্টর কি মত' এর শেষে চারিদিক থেকে অক্টোপাসের বাঁধনে আটকা পড়া বিজ্ঞানীর ভূমিকায় শেখর কাপুরের ঘাড় বেঁকিয়ে চেয়ারে মাথা কাত করে দেওয়ার দৃশ্য, যেখানে ইরফান খানের চরিত্রটি একটা পেপার ছুঁড়ে দিয়ে সব থেকে সাংঘাতিক বেদনাদায়ক সংবাদটি পরিবেশন করে শুধুই সিগারেট টানতে থাকে — এই দৃশ্যগুলো আমাদের কোনওদিন স্বস্তিতে থাকতে দেয় না। এগুলো বয়ে বেড়ানোর ভবিতব্য দর্শকের ওপর চাপিয়ে দেন উনি.

গল্প হলেও সত্যি সিনেমায় রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত
গল্প হলেও সত্যি সিনেমায় রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত

গল্প হলেও সত্যি সিনেমাটার কথাই ধরা যাক, আপাতভাবে কমেডি একটা সিনেমা, যদিও আমরা বুঝতে পারি যে কমেডির আড়ালে বদলে যাওয়া সমাজের একটা সোশ্যাল প্রবলেমকে উনি ডিল করেন এখানে (কিছুটা রক্ষণশীলতা থেকেও), তবুও জিনিসটা আমাদের চোখ সওয়া হয়ে যায় এবং আমরা হাসির আড়ালে এই বিষয়গুলি আছে জানা সত্ত্বেও রিয়্যাক্ট করি না। কিন্তু এই সিনেমার মধ্যেই এমন একটা অস্বস্তিকর জায়গা আছে যা কেবল দ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময় নয়, বরং বাজার সম্পর্কিত ধারণা তৈরির পর থেকে আপামর মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশ ও ক্রমবিবর্তনের ফর্মুলা বাতলে ফেলেছিলেন উনি। দৃশ্যটায় দেখা যায় একটি বিজ্ঞাপন অফিসের এডিটর তাঁর ডিজ়াইনার কর্মচারীটিকে বলছেন 'এস কিউব' এর কথা। এস ফর সেক্স, এস ফর স্যাডিজ়ম, এস ফর শক্! পুরো পৃথিবীটা যে আসলে একটা বাজার, একটা পাগলাগারোদ, আর যতরকমের আর্ট ফর্ম রয়েছে, মাস কমিউনিকেশনের মাধ্যম রয়েছে তাদের একমাত্র কাজ শুধু শক্ দিয়ে যাওয়া (জেনে, অজান্তে, চেতনে, অবচেতনে — সব ভাবে) — এই গুরুমন্ত্রটি শিখে ফেলি আমরা।