খেলাধুলা

একটি পরীক্ষামূলক সীমাবদ্ধতা

ক্রিকেটের সামনে প্রশ্ন উঠল—খেলার ফল কি সত্যিই সময়ের চেয়ে বড়? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর উত্তরটাও বদলাতে শুরু করল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অবশ্য ক্রিকেট কর্তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে অনির্দিষ্ট সময়ের ম্যাচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য বাস্তবসম্মত নয়।

অ

অনুষ্কা দাস

Oct 2, 2026

একটি পরীক্ষামূলক সীমাবদ্ধতা

ভাবুন, আপনি একজন ক্রিকেট ভক্ত। টেস্ট ম্যাচ দেখতে যাওয়ার জন্য আপনি অফিস থেকে ছুটি নেবেন। এবার বস বললো, “তাহলে কতদিনের ছুটি লাগবে?” আপনি উত্তর দিলেন, “সেটা তো জানিনা। পাঁচ দিন হতে পারে আবার আট দিনও হতে পারে।” এইরকম কথা এখন শুনলে মনে হয় এ নির্ঘাত পাগলের প্রলাপ! তবে ১৮৭৭ সালে যাওয়ার সুযোগ থাকলে দেখতেন এ তো রোজকার ব্যাপার।

এবার আসি আসল কথায়। আজ আমরা জানি টেস্ট ক্রিকেট মানেই পাঁচ দিনের লড়াই। পাঁচ দিন, দুই ইনিংস, নির্দিষ্ট সময়, তারপর ফলাফল—জয়, হার অথবা ড্র। কিন্তু এই পাঁচ দিনের ক্রিকেট একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে এমন এক দীর্ঘ যাত্রা, যেখানে ক্রিকেটকে কখনও সময়ের কাছে হার মানতে হয়েছে, আবার কখনও সময়কেই ক্রিকেটের নিয়মের মধ্যে বেঁধে ফেলতে হয়েছে।

টেস্ট ক্রিকেটের আনুষ্ঠানিক ইতিহাস শুরু হয় ১৫ মার্চ ১৮৭৭। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচটিই আজ বিশ্বের প্রথম টেস্ট ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক ছিলেন ডেভ গ্রেগরি, আর ইংল্যান্ডকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেমস লিলিহোয়াইট। অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে তোলে ২৪৫ রান। তার মধ্যে একাই ১৬৫ রান করেছিলেন চার্লস ব্যানারম্যান—টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান। এরপর অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৪ রান করে। ইংল্যান্ডের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৫৩। কিন্তু ইংল্যান্ড থেমে যায় ১০৮ রানে। অস্ট্রেলিয়া জেতে ৪৫ রানে। খেলা চলে মার্চের ১৫ থেকে ১৯। অর্থাৎ চার দিন, তবে মাঝে ছিল বিশ্রামের জন্য একটি দিন।

তবে ম্যাচ পাঁচ দিনের মধ্যেই শেষ করতে হবে এমন কিন্তু কোনো নিয়ম ছিলই না তখন। যেমন আরেকটা উদাহরণ দেখা যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ড, মেলবোর্ন, ৮–১৬ মার্চ ১৯২৯। মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত এই টেস্ট চলে আট দিন, যা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দীর্ঘতম টেস্ট। ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ৫১৯ রান তোলে; জবাবে অস্ট্রেলিয়া করে ৪৯১। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংস ২৫৭ রানে শেষ হলে অস্ট্রেলিয়ার সামনে ২৮৬ রানের লক্ষ্য দাঁড়ায়। অষ্টম দিনে অস্ট্রেলিয়া পাঁচ উইকেটে ম্যাচ জিতে যায়। ক্রিকেটের এই ফরম্যাট পরিচিত ছিল, ‘Timeless Test’ নামে। অর্থাৎ এমন টেস্ট ম্যাচ, যার জন্য আগে থেকে কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যক দিন ঠিক করা থাকত না। ম্যাচের লক্ষ্য ছিল একটাই— দুই দলের মধ্যে কোনো এক দলের জিত এবং অপর দলের হার। এখানেই ক্রিকেটের গল্পটা একটু অন্যরকম হয়ে যায়। আজ কোনও টেস্ট ম্যাচ পাঁচ দিন পর ড্র হলে আমরা জানি, সময় শেষ। কিন্তু Timeless Test-এ সময় শেষ হয়ে যাওয়ার ধারণাটাই ছিল অচেনা। ম্যাচ চলবে, যতক্ষণ না কোনও দল জিতছে। ফলে ক্রিকেট শুধু ব্যাট-বলের লড়াই থাকত না; হয়ে উঠত সহনশক্তির পরীক্ষা।

ভাবুন, একজন ব্যাটসম্যান ক্রিজে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর সামনে শুধু একজন বোলার নয়—দাঁড়িয়ে আছে সময়। কিন্তু সেই সময়ের কোনও শেষ নেই। তবে খুব স্বাভাবিকভাবেই অনন্ত সময় ধরে এইভাবে খেলা চলতে পারেনা। তাই ক্রমে ক্রমে দেখা দিলো বাস্তব সমস্যাগুলি। ৩ এপ্রিল ১৯৩০। জামাইকার কিংস্টনের সাবিনা পার্কে মুখোমুখি ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ম্যাচটি ছিল Timeless Test—অর্থাৎ আগে থেকে কোনও শেষদিন নির্ধারিত ছিল না। ইংল্যান্ড টস জিতে ব্যাট করতে নেমে যেন রানের পাহাড় গড়ে তুলল। ওপেনার অ্যান্ডি স্যান্ডহ্যাম একাই করলেন ৩২৫ রান—টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরি। তাঁর সঙ্গে লেস অ্যামস যোগ করলেন ১৪৯ রান। ইংল্যান্ডের ইনিংস থামল ৮৪৯ রানে। জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। প্রথম ইনিংসে মাত্র ২৮৬ রানে অলআউট হয়ে যায় তারা। ফলে ইংল্যান্ড পেয়ে যায় ৫৬৩ রানের বিশাল লিড। ইংল্যান্ড আবার ব্যাট করে ২৭২/৯-এ ইনিংস ঘোষণা করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে তখন জয়ের জন্য অসম্ভবের মতো ৮৩৬ রানের লক্ষ্য। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে ছবিটা বদলে গেল। অধিনায়ক কার্ল নুনেস করেন ৯২ রান, আর এরপর ব্যাট হাতে ঝড় তোলেন জর্জ হেডলি। তাঁর ব্যাট থেকে আসে দুর্দান্ত ২২৩ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সপ্তম দিনের শেষে পৌঁছে যায় ৪০৮/৫-এ। ম্যাচ তখনও শেষ হয়নি, আর Timeless Test-এর নিয়ম অনুযায়ী শেষ হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু ক্রিকেট মাঠের বাইরের পৃথিবী যেন আর অপেক্ষা করতে রাজি ছিল না। ইংল্যান্ড দলের দেশে ফেরার জন্য নির্ধারিত জাহাজের সময় এগিয়ে আসছিল। ফলে ম্যাচের নবম দিনে, ফলাফল না বেরোলেও, দুই দলকে ম্যাচটি ড্র হিসেবে মেনে নিতে হয়। এই ম্যাচটাই দেখিয়ে দেয়— মাঠে খেলার সময়ের কোনও সীমা না থাকলেও, ক্রিকেটারদের জীবনে সময়ের সীমা ছিল। আর সেই সীমাই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফলের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।

১৮৭৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে মোট ৯৯টি Timeless Test খেলা হয়েছিল। এর মধ্যে ৯১টি হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে অস্ট্রেলিয়ায় সব টেস্টই মূলত এই সীমাহীন কাঠামোয় খেলা হত। আসলে তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সূচি আজকের মতো ছিল না। টেলিভিশন সম্প্রচার, সম্প্রচারস্বত্ব, নির্দিষ্ট সপ্তাহান্তের অনুষ্ঠান—এসবের চাপ ছিল না। ক্রিকেটারদের সফরও ছিল দীর্ঘ, কিন্তু ম্যাচের সময়সূচি তুলনামূলকভাবে নমনীয় ছিল আজকের তুলনায়। তবু ধীরে ধীরে বিভিন্ন সমস্যা সামনে আসতে শুরু করল।

কারণ একটা ম্যাচ কতদিন চলবে, তা যদি কেউ জানতেই না পারে, তাহলে পরের ম্যাচের পরিকল্পনা হবে কীভাবে?

এই গল্প নাটকীয় মোড় নেয় ১৯৩৯ সালের ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ। ডারবানে শুরু হওয়া সেই ম্যাচ গড়িয়েছিল ১২ দিন পর্যন্ত। ৩ মার্চ ১৯৩৯, ডারবানের কিংসমিডে শুরু হয় ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার সিরিজের পঞ্চম ও শেষ টেস্ট। সিরিজের ফল নির্ধারণের জন্য আগে থেকেই ঠিক ছিল—ম্যাচটি হবে Timeless, অর্থাৎ ফল না বেরোনো পর্যন্ত খেলা চলবে। দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম ইনিংসে করে ৫৩০, ইংল্যান্ড ৩১৬। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা ৪৮১ রান করে ইংল্যান্ডের সামনে দেয় ৬৯৬ রানের লক্ষ্য। জবাবে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং যেন থামতেই চাইল না—বিল এডরিচ ২১৯, ওয়ালি হ্যামন্ড ১৪০ এবং পল গিব ১২০ করে দলকে নিয়ে যান ৬৫৪/৫-এ। জয় থেকে তখন মাত্র ৪২ রান দূরে ইংল্যান্ড। কিন্তু খবর আসে ইংল্যান্ডকে দেশে ফেরার জাহাজ ধরতেই হবে। তাই ১৪ মার্চ ম্যাচটি ড্র ঘোষণা করা হয়। ৩ মার্চ থেকে ১৪ মার্চ—মোট ১২ দিন, যার মধ্যে ৯ দিন খেলা হয়েছিল। বাকি বিশ্রাম এবং বৃষ্টির কারণে খেলা হয়নি তিনদিন। এটাই হয়ে ওঠে শেষ Timeless Test এবং ক্রিকেট ইতিহাসের দীর্ঘতম টেস্ট। ম্যাচটিতে মোট ৪৩ ঘণ্টা ১৬ মিনিট খেলা হয়, ১,৯৮১ রান এবং ৫,৪৪৭টি বল হয়। এই ম্যাচটি দেখিয়ে দিল, ফল নিশ্চিত করার জন্য তৈরি নিয়মই শেষ পর্যন্ত ফল নিশ্চিত করতে পারছে না। অনির্দিষ্ট সময়ের ম্যাচের কারণে সফরের সূচি, যাতায়াত এবং পরবর্তী ম্যাচের পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে ক্রিকেটের সামনে প্রশ্ন উঠল—খেলার ফল কি সত্যিই সময়ের চেয়ে বড়? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর উত্তরটাও বদলাতে শুরু করল।

প্রথম ক্রিকেট ম্যাচের কাল্পনিক ছবি। সূত্র: উইকিপিডিয়া
প্রথম ক্রিকেট ম্যাচের কাল্পনিক ছবি। সূত্র: উইকিপিডিয়া

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অবশ্য ক্রিকেট কর্তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে অনির্দিষ্ট সময়ের ম্যাচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। ৮ মার্চ ১৯৫৫, তৎকালীন Imperial Cricket Conference—যে সংস্থা পরে ICC হয়ে ওঠে—একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়।

টেস্ট ক্রিকেট ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট দিনের কাঠামোর দিকে এগোতে লাগল। পাঁচ দিনের টেস্ট ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রধান রূপ হয়ে উঠল। এর ফলে ম্যাচ পেল একটি স্পষ্ট কাঠামো—প্রথম দিন থেকে পঞ্চম দিন পর্যন্ত লড়াই, তারপর ফলাফল। পাঁচ দিনও এখন যথেষ্ট দীর্ঘ। একজন ব্যাটসম্যানকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাট করতে হয়। একজন বোলারকে বারবার দৌড়ে এসে বল করতে হয়। পিচ বদলায়, বল পুরনো হয়, বদলায় আবহাওয়া, শরীর ক্লান্ত হয়। আর এই সবকিছুর মধ্যে বদলে যায় ম্যাচের পরিস্থিতিও। প্রথম দিনের সবুজ পিচে যে দল দাপট দেখায়, তৃতীয় দিনে সেই পিচই ব্যাটসম্যানের স্বর্গ হয়ে উঠতে পারে। চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে আবার স্পিনারদের জন্য তৈরি হতে পারে অন্য গল্প। অর্থাৎ পাঁচ দিনের ক্রিকেট আসলে সময়কে কমিয়ে দেয়নি; সময়কে ক্রিকেটের কৌশলের অংশ করে তুলেছে। এই পাঁচ দিনের মধ্যেই তৈরি হয় নাটক। কেউ প্রথম ইনিংসে শতরান করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়। কেউ দ্বিতীয় ইনিংসে এসে সব হিসাব বদলে দেয়। কোনও দল চার দিন আধিপত্য দেখিয়েও পঞ্চম দিনে জয়ের কাছাকাছি এসে থেমে যায়। আবার কোনও দল প্রথম তিন দিন পিছিয়ে থেকেও শেষ দু’দিনে ম্যাচের ছবি বদলে দেয়।

এই কারণেই টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য শুধু তার দৈর্ঘ্যে নয়, তার সৌন্দর্য সময়ের ব্যবহারের মধ্যেই।

Timeless Test-এর যুগে প্রশ্নটা ছিল — “ম্যাচ কবে শেষ হবে?” আর পাঁচ দিনের টেস্টে প্রশ্নটা বদলে হল—“পাঁচ দিনের মধ্যে কে গল্পটা নিজের মতো করে লিখতে পারবে?” ক্রিকেট সময়কে বেঁধেছে ঠিকই, কিন্তু সেই বাঁধনের মধ্যেই রয়েছে এমন এক নাটক, যার শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্য কখনও কখনও পঞ্চম দিনের শেষ বল পর্যন্ত অপেক্ষা করায়।