হাওয়াভাস
অবশেষে ১৮৮১ সালে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে পৌঁছে গেল পাহাড়ের শীর্ষে। পাহাড়ের ইতিহাসে সে এক নতুন অধ্যায়। প্রথম দিকে এর নাম ছিল দার্জিলিং স্টিম ট্রামওয়ে; পরে এটি পরিচিত হয় দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে নামে।
তিতলি
Oct 2, 2026

“Kasto mazza hai lelaima Ramailo o kaali odhali” সৈফ আলি খান এবং বিদ্যা বালান অভিনীত ‘পরিণীতা’ সিনেমায় সনু নিগমের কণ্ঠে আমরা শুনতে পাই এই দুটি লাইন, পর্দায় ভেসে ওঠে পাহাড়ের গা বেঁয়ে নেমে আসা ‘টয় ট্রেন’। তবে শুধু ‘পরিণীতা’ নয় ; দার্জিলিং এবং তার টয় ট্রেন বারবার উঠে এসেছে সিলভার স্ক্রিনে। সত্যজিত রায়, শক্তি সামন্ত থেকে শুরু করে আজকের সুজয় ঘোষ, অনুরাগ বসু… পাহাড়ের রাণী স্বমহিমায় বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। তবে সে কথা এখন থাকুক। দার্জিলিং শহরের ইতিহাস, এর বরফশোভিত কাঞ্চনজঙ্ঘা, স্নিগ্ধ ঝর্ণা, মায়াবী আবহাওয়া নিয়ে না হয় অন্য পর্বগুলিতে কথা হবে। আজকের পর্ব থাকুক তাকে নিয়ে যে পাহাড়ের গা বেয়ে সাপের মতো চলে যায়।
আমাদের বাড়ির পাশের অতি পরিচিত চঞ্চলা কিশোরীর মতো সে কারোর বাড়ির পেছনের অংশ দিয়ে আবার কারোর বাড়ির উঠোন দিয়ে কখনও আবার একটা ছোট্ট মুদিখানা দোকানের সামনে থেকে চঞ্চল পায়ে ছুটে বেড়ায়। ভাবখানা এমন যেন এই সবই তো তার আপন, তার নিজের। ভোরের কুয়াশা তখনও নামেনি শিলিগুড়ির সমতলে। রেললাইনের ওপর শিশির জমে আছে, আর তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট্ট নীল ইঞ্জিন। চোখে পড়ার মতো বড় নয় সে, মাত্র দুই ফুট চওড়া লাইনের ওপর তার সংসার। কিন্তু তার সামনে যে পথ, তা বিশাল। এই পথ গিয়ে ঠেকেছে হিমালয়ের কোলে, সাত হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায়। বয়লারে আগুন জ্বলে উঠল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠল আকাশে। ছোট্ট বাঁশি বেজে উঠল, ছোট্ট নীল ট্রেনটি ধীরে ধীরে কেঁপে ওঠে, তারপর শুরু হয় তার পাহাড়ে চড়ার যাত্রা। সবাই তাকে ‘টয় ট্রেন’ বললেও, তার যাত্রাপথ কিন্তু মোটেই খেলার জিনিস নয়।
গল্পটা শুরু হয়েছিল অনেক আগে। ১৮৩৫ সালে সিকিমের রাজার কাছ থেকে দার্জিলিং অঞ্চল ইজারা নেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সমতলের গরমে হাঁপিয়ে ওঠা ইংরেজ কর্তারা দেখলেন, এ তো স্বর্গ! জায়গাটা হয়ে উঠল তাঁদের গ্রীষ্মকালীন আশ্রয়। কিন্তু সমতল থেকে পাহাড়ে পৌঁছনোর পথ তখন ছিল ধীর আর কষ্টকর। পাহাড়ের গায়ে গজিয়ে ওঠা চা-বাগানের পাতাও সমতলে নামানো ছিল কষ্টের। তখন কয়েকজন ভাবলেন, পাহাড়ের গা বেয়ে যদি রেললাইন পাতা যায়! শোনা মাত্র অনেকে হেসে উঠল। এত খাড়া পাহাড়ে ট্রেন? অসম্ভব। তবু ফ্র্যাঙ্কলিন প্রেস্টেজ নামের এক রেল কর্মকর্তা পিছু হটলেন না। ১৮৭৯ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। কুড়াল, গাঁইতি আর অসীম ধৈর্য নিয়ে পাহাড় কাটলেন নেপালি, লেপচা আর ভুটিয়া শ্রমিকেরা। বৃষ্টি, ধস, জোঁক আর জঙ্গলের সঙ্গে লড়াই করে একটু একটু করে পাতা হল লাইন। অবশেষে ১৮৮১ সালে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে পৌঁছে গেল পাহাড়ের শীর্ষে। পাহাড়ের ইতিহাসে সে এক নতুন অধ্যায়। প্রথম দিকে এর নাম ছিল দার্জিলিং স্টিম ট্রামওয়ে; পরে এটি পরিচিত হয় দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে নামে।
সুকনা ছাড়াতেই বদলে যায় পৃথিবী। রুক্ষ সমতল মিলিয়ে যায় আর তার জায়গায় আসে ঘন শাল আর সেগুনের বন। গাছের ফাঁক গলে রোদ এসে পড়ে লাইনের ওপর, যেন কেউ সোনার জাল বিছিয়ে দিয়েছে। বুনো ফুলের গন্ধ ভেসে আসে, আর বনের গভীর থেকে ডেকে ওঠে কত অচেনা পাখি।
তারপর আসে এক সেই অদ্ভুত কৌশল। পাহাড় এত খাড়া যে সোজা উঠে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই ট্রেন একটু এগোয়, থামে, তারপর পিছোতে শুরু করে। আবার এগোয়, আবার পিছোয়, এইভাবে জিগজ্যাগ করে সিঁড়ি ভাঙার মতো ওপরে ওঠে। তিনদাড়িয়ার কাছে দেখা যায় অবাক করা কান্ড! লাইন এক জায়গায় নিজের ওপর দিয়েই পাক খেয়ে পার হয়ে গেছে। যে পথ দিয়ে এইমাত্র ট্রেন গেল, কয়েক মিনিট পরে সে-ই পথ আবার তার পায়ের নিচে। কার্শিয়াংয়ে এসে আবার চায়ের গন্ধে ভরে ওঠে বাতাস। ঢালু পাহাড়ের গায়ে সারি সারি চা-বাগান। কুয়াশা সরে যেতেই দূরে ঝিকমিক করে ওঠে রুপোলি এক রেখা - তিস্তা নদী।
আরও ওপরে ট্রেন ঢুকে পড়ে মেঘের ভেতর। চারদিক সাদা, ঠান্ডা, নিঃশব্দ। শুধু ইঞ্জিনের ছুক ছুক আর চাকার ছন্দ। প্রায় ৭,৪০৭ ফুট উচ্চতায় ঘুম স্টেশন, এই পথের গন্তব্য, ভারতের অন্যতম উঁচু রেলস্টেশন। এখানকার ঘুম মনাস্ট্রির ঘণ্টাধ্বনি যেন ট্রেনকে স্বাগত জানায়। তারপর শুরু হয় তার নামা, আর আসে বাতাসিয়া লুপ। ১৯১৯ সালে তৈরি এই গোলাকার বাঁক পাহাড়ের গায়ে জড়িয়ে আছে, যাতে খাড়াই কমিয়ে ট্রেনের যাত্রা মসৃণ করা যায়। মাঝখানে সবুজ বাগান, আর গোর্খা সৈনিকদের স্মৃতিতে গড়া এক স্মারক। ভাবুন তো, ট্রেন যখন সেই বাঁক ঘুরছে, ঠিক তখনই মেঘ গেল সরে; আর আপনার সামনে জেগে উঠল “The mighty Kanchenjunga”।
তবে এই পথ কখনও সহজ ছিল না। বর্ষায় বারবার ধসে ভেসে গেছে লাইন, বন্যা আর ভূমিকম্প ক্ষতি করেছে। প্রতিবারই পাহাড়ের মানুষ আবার লাইন গড়ে তুলেছেন। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো এই রেলপথকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। এশিয়ার প্রথম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় রেলপথ হিসেবে এই সম্মান পায় দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে।
আজকের দুনিয়া দুরন্ত গতিতে ছুটছে। হাইওয়ের গাড়িগুলির কাছে আর বিমানের কাছে এই ট্রেনের গতি হয়তো হার মানে। কিন্তু সে তো কখনও গতির প্রতিযোগিতায় নামেনি। সে জানে, কিছু পথ থাকে যেখানে সবাই গন্তব্যে পৌঁছনোর জন্য নয় যায় না, যায় দেখার জন্য। ওই যে অনেকটা “সফর খুবসুরত হ্যায় মঞ্জিল সে ভি”র মতো ব্যাপারটা। দেড়শো বছর ধরে সে বয়ে চলেছে ইতিহাস, শ্রমিকের ঘাম, চায়ের সুবাস আর কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনালি ভোর।
তাই আজও, কুয়াশা মাখা কোনও ভোরে, পাহাড়ের গা বেয়ে শোনা যায় সেই চেনা ছন্দ: ছুক ছুক, ছুক ছুক। যেন পাহাড় আর সময় দুজনে মিলে বলছে, ধীরে ধীরে চলো, দেখতে দেখতে চলো।
