আনাড়িয়ানা

অসুখ

দূর থেকে ভেসে আসা টং এর আওয়াজটা যেন গোটা মহল্লাকে একেবারে ঝাঁঝড়ে তুলেছে। দিন দশেক হলো রেডিওটার ব্যামো। ডাক্তার- বদ্দি যে দেখাব তার উপায়ও নেই।

স

সায়ন হালদার

Oct 2, 2026

অসুখ

পর্ব ১

লিখছেন সায়ন হালদার

দূর থেকে ভেসে আসা টং এর আওয়াজটা যেন গোটা মহল্লাকে একেবারে ঝাঁঝড়ে তুলেছে। দিন দশেক হলো রেডিওটার ব্যামো। ডাক্তার- বদ্দি যে দেখাব তার উপায়ও নেই। প্রেসকিপশন সহ ওষুধ পত্র নিয়ে শ'পাঁচেক টাকা মতো যে খসবে এটুকু অন্তত আশা করাই যায়।

তার ওপর সক্কাল সক্কাল চায়ে চিনি ঢ়ালতে ঢ়ালতে উদীয়মান, উর্দীধারী এক উড়নচণ্ডী এসে হাজিরা দিয়ে বসে। শালার এক্কেবারে চামড়া কাটা ব্যক্তিত্ব। আঁতকে উঠলাম। জামার ভিতরের জমিটাতে একটুকরো মাংসও আর অবশিষ্ট নেই । জিজ্ঞাসা করায় বলে-" খেয়ে ফেলেছি। নিজের বলতে শুধু ছেঁড়া পকেটবিশিষ্ট কলারবিহীন এই একরোখা জামাটা। কানাঘুষো করবার আগেই ভ্যানিশ।

আবহাওয়ার পাঁচমিশালী ব্যাপারটা এখন কিছুটা জেলবন্দী আসামীর মতো দেখাচ্ছে। তাঁবেদারি মাখা তাগড়াই মালগুলো তাদের স্যাঁতলা ঠোঁটে চুরুট শুকোতে ব্যস্ত। ভীড় উপচে পড়ছে। সরগরম করা কেচ্ছা। একেবারে হইহই-রইরই কান্ড। পোট্রেট অথবা ল্যান্ডস্কেপ, এনিথিং।

বেখাপ্পা একখানা গানের সুর কানটাকে একেবারে ঝাঁঝিয়ে তুলল। মাঠকোটার পাশে অতিশয় ডপকা গোছের এক হরবোলা তার বুলি আওরাচ্ছে। কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো চশমার পাওয়ারটা হঠাৎ করেই যেন বেড়ে গেছে। বার দু-এক চোখটা কচলে সেটিকে ধারণ করলাম। সেই অতিশয় ডপকা হরবোলার মুখ থেকে যেন ক্রমাগত নানা রঙের পায়রা নির্গত হতে থাকে। সে কী রঙের বাহার! লাল, সবুজ,কালো এগুলোর পাশাপাশি নীল এবং গেরুয়া। তাছারা ডানা ঝাপটানোর নানাবিধ ভঙ্গিমা তো আছেই। কিন্তু তার থেকে দু-চারটে পালক যদি খসে পড়ে,ব্যস তাহলে আর রক্ষে নেই, যাকে বলে একেবারে ধুন্ধুমার কাণ্ড। ছাই রঙা সূর্যটার চোখ রাঙানি আর সহ্য করতে না পেরে পাশের বাড়ির আম গাছটা তার থেকে খান -বিশেক আম মাটিতে ঝরিয়ে দিল। সেই ডপকা পিসটার একটু কাছে যেতেই পানের পিক মিশ্রিত থিকথিকে কর্দমাক্ত পদার্থটি আমার জুতোর পুরু শোলটাতে এঁটে যায়। সেটিকে ধুয়ে ফেলার অভিপ্রায়ে রওনা হলাম কলতলার উদ্দেশ্যে। তারপর আর ফেরা হয়নি।

দুর্বোধ্য অথচ তীব্র একটা গন্ধ আমার ঘ্রাণের কাছাকাছি ঘেঁষতে চাইল। ব্যটার তেজ দেখে বেমালুম একখানা সিগারেট চড়িয়ে বসলাম যার ধোঁয়ার চওড়া বাঁকে আকাশটাকে কেমন যেন ফ্যাকাশে গোছের লাগছিল, ঠিক যেন টাল খাওয়া আ্যনিমিয়া। ঘাটের ধারে শ্যাওলা খুঁটতে খুঁটতে সেটা নীচে নেমে আসে, একেবারে শিরার কাছাকাছি। পেশীর আ্যনাটমি ছিঁড়ে খানখান করে দেয়। ঘাটের জল বাড়ন্ত। বিপর্যয়ের সুতোয় পাক ধরেছে। কাটিয়ে ওঠা রীতিমত ঝক্কির। ইতিমধ্যে ভাটার টানে পা থেকে কিছুটা জল সরে যায়।

টঙের আওয়াজটা ক্রমশ তীব্র হতে থাকে । চড়ুইয়ের চিৎকার পাশের পাড়ার হাঁড়িতে টগবগ করে ফুটছে, একেবারে চড়ুইভাতির আমেজে।

আঙুলের ক্ষয়িত বাঁকে ভীড় জমাতে থাকে কাঁচা রোদের টুকরোগুলো। তেল চটচটে ঘেমো সন্ধ্যায় আরো এক পশলা তৈল নিক্ষেপ করা হলো চপ কাটলেটের আ্যন্টি ডোজের সাথে। শহর জুড়ে তখন হ্যালোজেনের একচেটিয়া হল্লাবাজি। বমি আর কফের উগ্র মিশ্রনে জানটাও যেন একেবারে ঝাঁপি টেনে বসে।

পেণ্ডুলামের কালচে ছায়ার ভাঁজে পার হতে থাকে দিন থেকে মাস, মাস থেকে বছর, যূগ-যূগান্তর, কাল, শতাব্দী আরো কত কী! ডোপামিনের চাগাড়টা এবার কিছুটা হলেও থিথিয়ে আসে। জং খাওয়া ল্যম্পপোস্টের ঠাণ্ডা আলোটার সময় ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে।- "আমাদের পাপ লাগবে যে ঠাকুর!"

--"বাপ-ঠাকুরদার র‌্যাস গায়ে মেখে বসে আছো যে বাছাধন, চুলকুনি তো হব্বেই!"

ক্যাকোফনির স্যাঁতসেঁতে গোঙানিটা তারের নিষাদ বরাবর আর নামতে পারে না।