কলমচিনামা

সাদা আমি কালো আমি -র এক নিরন্তর অনুসন্ধানকারী গ্রাহাম গ্রিন

গ্রাহাম গ্রিন অনুভব করছিলেন 'পোলারাইজ়ড' হয়ে থাকার দিন শেষ! একপাক্ষিক সাদা বা কালোর কোনও ধ্রুব অস্তিত্বই নেই আসলে। এই নিরন্তর সাদা কালোর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেওয়া দুর্গের ন্যারেশনকে ভেঙেছেন উনি।

ক

কুহক

Oct 2, 2026

সাদা আমি কালো আমি -র এক নিরন্তর অনুসন্ধানকারী গ্রাহাম গ্রিন

গ্রাহাম গ্রিন বিংশ শতাব্দীতে উপন্যাসের ফর্ম ও এগজ়িকিউশন নিয়ে ফালাফালা করা শাঁসানো সব উপন্যাস রচয়িতাদের একজন না হয়েও ওঁর সমাজকে অনুভব করার প্রগাঢ় ক্ষমতা ওঁকে যুগ নয় যুগান্তরের লেখক হিসেবে তখমা দিয়েছে।

পেশায় সাংবাদিক ছিলেন বলেই হয়তো প্রাত্যহিক ঘটনার মধ্যে অতিরিক্ত গন্ধ পেতে পেতে উনি অনুভব করছিলেন 'পোলারাইজ়ড' হয়ে থাকার দিন শেষ! একপাক্ষিক সাদা বা কালোর কোনও ধ্রুব অস্তিত্বই নেই আসলে। এই নিরন্তর সাদা কালোর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেওয়া দুর্গের ন্যারেশনকে ভেঙেছেন গ্রাহাম। বারবার প্রশ্নে জর্জরিত করেছেন পাঠককে, কে আগে? দেশ না মানবতা? গনতন্ত্র না জাতির স্বার্থে সবার উপরে সহিংসতা? হত্যাকারীর আদর্শবাদের সাফাইকে কীভাবে দেখা উচিত? উদাসীন স্বার্থপরতা, নিরপেক্ষতার রাজনীতি কতটা ব্যাধির আবার কতটা ওষধির?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে গ্রাহামের তিনটি উপন্যাসের দিকে তাকালে বোঝা যায় ওঁর সমাজ বিশ্লেষণী দৃষ্টি এবং ফিকশনের মাধ্যমে নতুন থিসিস প্রনয়োনের বিচক্ষণতা।

দ্য কোয়াইট আমেরিকান বইয়ের প্রথম সংস্করণ
দ্য কোয়াইট আমেরিকান বইয়ের প্রথম সংস্করণ

একটি উপন্যাস 'দ্য কোয়াইট আমেরিকান', যেখানে একজন বয়স্ক ব্রিটিশ সাংবাদিক, নাম টমাস ফাউলার, তিনি রাজনীতিতে জড়াতে চান না। সময়টা ইন্দোচিন যুদ্ধের সময় এবং স্থান ভিয়েতনামের সাইগন শহর। ফাউলার ফুওং নামের এক তরুণী ভিয়েতনামি নারীর সঙ্গে থাকেন। সেখানে আসে আদর্শবাদী তরুণ আমেরিকান অ্যাল্ডেন পাইল। সে ভিয়েতনামে "তৃতীয় শক্তি" গড়ে তুলতে চায়, আর ফুওংকেও ভালোবেসে ফেলে। ওদিকে পাইল-এর গোপন কার্যকলাপের ফলে সাইগনের এক চত্বরে বোমা বিস্ফোরণে বহু নিরীহ মানুষ মারা যায়। এই ঘটনার পর ফাউলার নিরপেক্ষতা ত্যাগ করেন এবং পাইলকে হত্যা করার ব্যবস্থা করেন। শেষে ফুওংকে ফিরে পেলেও অপরাধবোধ তাঁকে ছাড়ে না।

এখানে রাজনৈতিক পটভূমিতে লেখা এই টেক্সটে অরাজনৈতিকতার 'মিথ' এর ভয়াবহতাকে ছুঁড়ে দেন গ্রাহাম।

আরেকটি উপন্যাস, দ্য পাওয়ার অ্যান্ড দ্য গ্লোরি। ১৯৩০-এর দশকের মেক্সিকোতে সরকার গির্জার বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। পুরোহিতদের হয় হত্যা করা হয়, নয় বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়। শুধু একজন পুরোহিত পলাতক থাকেন, যাঁকে 'হুইস্কি প্রিস্ট' বলা হয়। তিনি মদ্যপ, তাঁর একটি অবৈধ কন্যাও আছে, আর নিজেকে অযোগ্য মনে করেন। অন্যদিকে এক আদর্শবাদী পুলিশ লেফটেন্যান্ট ধর্মকে নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর। পুরোহিত নিরাপদ অঞ্চলে পালিয়ে যেতে পারতেন, কিন্তু এক মুমূর্ষু মানুষের শেষ স্বীকারোক্তি শুনতে ফিরে আসেন। সেটি ছিল ফাঁদ, আর তিনি ধরা পড়েন। শেষে তাঁকে গুলি করে মারা হয়, কিন্তু উপন্যাসের শেষে আরেক পুরোহিত গ্রামে এসে পৌঁছান।

এখানেও দেখা যায় কীভাবে গ্রাহাম ব্যক্তিজীবনের চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে সেই খুঁজে পেতে চান, জেনে নিতে চান, মানুষের সাদা কালোর মিশ্রন।

আরেকটি উপন্যাসের উল্লেখ আমরা করব। দ্য কমেডিয়ান্স। ডাক্তার "পাপা ডক" দুভালিয়ের নিষ্ঠুর শাসনে থাকা হাইতি এই উপন্যাসের পটভূমি। আতঙ্ক ছড়ায় তাঁর গুপ্ত বাহিনী "টন্টন ম্যাকুট"। কথক ব্রাউন পোর্ট-অ-প্রিন্সের এক প্রায় পরিত্যক্ত হোটেলের মালিক। জাহাজে ফেরার পথে তাঁর পরিচয় হয় সরল আমেরিকান মিস্টার স্মিথ এবং ভণ্ড "মেজর" জোন্সের সঙ্গে। ব্রাউনের সঙ্গে এক জার্মান রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী মার্থার গোপন প্রেমও চলে। দেশে ভয়, খুন আর দুর্নীতি বাড়তে থাকে। কমিউনিস্ট ডাক্তার ম্যাজিওট নিহত হন, আর ব্রাউন শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। শেষে তিনি দেশ ছেড়ে পালান। লক্ষণীয় বিষয় উপন্যাসের প্রায় সব চরিত্রই নিজেদের আসল পরিচয় আড়াল করে ভান করে চলে।

এই তিনটে উপন্যাস সামান্য উদাহরণ মাত্র, গ্রাহামের যেকোনও কাজের মধ্যেই আসলে যে 'রাজনৈতিক' অন্বেষণ রয়েছে, যে গ্রে শেড এর উন্মেষ রয়েছে, তা বর্তমান শতাব্দীতে এসেও রোজ একটু একটু করে বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়।

গ্রালাম গ্রিনের জন্মদিনে ওঁর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে মানুষের ভিতরকার এক অবয়বকে আছাড়িপাছাড়ি করে খুঁড়ে চলার নিষ্ঠার দিকেই আমরা একুশ শতকের 'ডেটা' বা 'ডিজিটাল' লড়াইয়ের ময়দান থেকে ফিরে তাকাতে পারি।